
আশির দশকে আমার শৈশব কেটেছে দুরন্তপনা আর উচ্ছ্বাসে ভরা এক গ্রামবাংলার পরিবেশে। দুরন্তপনার মধ্য দিয়েই আমার শৈশব জীবন চলতো। চৌকিদার বাড়ির দরজার স্কুলে পড়াশোনা করতে গিয়ে প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড়তাম। এমনই এক পরিস্থিতির পর আমি সহ আমার চাচাতো দুই ভাই—হারেছ এবং তরিকুল ইসলাম—তিনজনে মিলে গঙ্গাকীর্তি বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তি হই। শুনে অবাক হচ্ছেন? আসলে আমাদের এলাকায় গুলি গ্রামের মধ্যে একটি মাত্র প্রাইমারি স্কুল ছিল, যার নাম ছিল বালিকা স্কুল; কিন্তু সেখানে ছেলে-মেয়ে উভয় ছাত্রছাত্রীই পড়াশোনা করত।
আমরা আশির দশকে যে প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হই, তার আসল নাম ছিল মল্লিকা হক প্রাইমারি স্কুল। পরবর্তীকালে এই স্কুলটি গঙ্গাকীর্তি সরকারি প্রাইমারি স্কুল নামে পরিচিত হয়। সে সময় স্কুলটির প্রধান শিক্ষক ছিলেন নেজামুল ইসলাম স্যার। তিনি শিক্ষাগত যোগ্যতায় কেবল ‘মাইনর পাশ’ ছিলেন—অর্থাৎ পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। বর্তমান সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হলেও, তৎকালীন গ্রামবাংলায় এটাই ছিল বাস্তবতা।
স্কুলের অন্যান্য শিক্ষকদের কথাও আজও স্পষ্ট মনে পড়ে। বারেক স্যার অংক পড়াতেন; অনেক সময় ক্লাসে টেবিলের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়তেন। মাওলানা ইউনুছ স্যার ছিলেন একজন ইসলামী আকীদার মানুষ। তিনি সবসময় পাঞ্জাবি-পায়জামা পরতেন এবং মাথায় গোল টুপি থাকত। পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি আমাদের ভালোভাবে চলার, নৈতিক জীবন গড়ার উপদেশ দিতেন। পাঠান স্যার ছিলেন অত্যন্ত রাগী; অল্পতেই তার মেজাজ গরম হয়ে যেত। ইয়াছিন স্যার ধর্মীয় বই পড়াতেন। আব্দুল্লাহ স্যারকেও বেশ মনে পড়ে।
প্রধান শিক্ষক নেজামুল ইসলাম স্যার ছিলেন ভোলা সদর উপজেলার খড়কি এলাকার বাসিন্দা। চোখে আতশি কাচের চশমা, মাথায় গোল টুপি, গায়ে রঙিন পাঞ্জাবি—এই ছিল তার চিরচেনা রূপ। পায়ে পরতেন মহিলাদের ব্যবহৃত খুব কম দামের প্লাস্টিকের জুতা। এই জুতা পরা নিয়ে লোকজন, এমনকি ছাত্রছাত্রীরাও আড়চোখে তাকাত, হাসাহাসি করত। অনেকেই মজা করে বলত, “হেডমাস্টার স্যার তো মহিলা গো জুতা পায়ে দেয়!”
তবে নেজামুল ইসলাম স্যার ছিলেন অত্যন্ত মিতব্যয়ী মানুষ। অপ্রয়োজনীয় কিছু খেতেন না, পড়তেন না, কিনতেন না। একই পোশাক-আশাক বহু বছর ধরে ব্যবহার করতেন। তার হাতে থাকা ছাতিটির শিকের রং পাঞ্জাবিতে লেগে স্থায়ী দাগ পড়ে গিয়েছিল। লাইব্রেরিতে বসে চশমা চোখে সারাদিন তিনি কী যেন নিখুঁতভাবে লিখতেন—আমরা স্কুলের জানালা দিয়ে তাকিয়ে তা দেখতাম।
স্কুলটি ছিল পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত, দক্ষিণমুখী এল-সিস্টেমের টিনের ঘর। সামনে খানিকটা মাঠ থাকলেও তা খেলাধুলার জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। ফলে ছাত্রছাত্রীদের খেলতে বেশ কষ্ট হতো। আমরা অনেক সময় ভুইয়াবাড়ীর দরজায় কিংবা স্কুলের পূর্ব পাশে থাকা বিশাল দিঘির পাড়ে খেলাধুলা করতাম। সুঁটি বাগানে লুকোচুরি খেলতাম। পোশাক-আশাক উপরে খুলে রেখে দিঘির জলে জলকেলি করতাম। হারা-হারি, মগ-মগ—এসব খেলাই ছিল আমাদের নিয়মিত আনন্দ।
আমার সময়ে সহপাঠীদের অনেকের নাম আজও মনে আছে—মোঃ নুর আলম, মোঃ তরিকুল ইসলাম, মোঃ হারেছ, মোঃ শামসুদ্দিন, মোহাম্মদ নুরুদ্দিন,মোঃ জাফর, আবি আব্দুল্লাহ, মোঃ রুপা, আবুল কালাম আজাদ, মোঃ এনায়েত জাফর , তাসলিমা বেগম, তাছনুর বেগম, হাফছা বেগম, মিনতি রানী, আরতি রানী, মরিয়ম, রাবেয়া বেগম, শাহিনা বেগম, শিরীন আক্তার —তারা সবাই আমার শৈশবের প্রাইমারি স্কুলের সহপাঠী ছিলেন।
স্কুল মাঠের পশ্চিম পাশে দুইটি মোটা, অপরিচিত তালগাছের মতো উঁচু লম্বা গাছ ছিল। একটি ছিল তাল পাম গাছ, অন্যটি বোতল পাম গাছ। স্যারগণ আমাদেরকে এই বিদেশি গাছগুলোর নাম শিখিয়েছিলেন—যা আমাদের কৌতূহলী মনকে আরও সমৃদ্ধ করেছিল।
তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার কয়েকদিন পরেই প্রথম পরীক্ষায় আমি প্রথম স্থান অধিকার করি। এর ফলস্বরূপ আমার রোল নম্বর হয় ১ এবং আমাকে ক্লাস ক্যাপ্টেন করা হয়। দুরন্ত শৈশবে দুষ্টুমির পাশাপাশি পড়ালেখায়ও আমি ছিলাম প্রখর মেধাবী। বরাবরই পরীক্ষার ফলাফল খুব ভালো হতো। প্রতিটি বিষয়ে ভালো নম্বর পেয়ে প্রায়ই প্রথম স্থান অর্জন করতাম।
ক্লাস চলাকালীন সময় কোনো ছাত্রছাত্রী বেয়াদবি করলে বা সামান্য শব্দ করলেও আমি ছোট কাগজে গোপনে তার নাম লিখে স্যারদের হাতে তুলে দিতাম। সঙ্গে সঙ্গে পাঁচ ব্যাত, কখনো দশ ব্যাত পড়ত। ফলে ক্লাস চলাকালীন ভয়ে কোনো ছাত্রছাত্রী কথা বলা তো দূরের কথা, সামান্য শব্দও করত না। আমাকেও সবাই সমীহ করে চলত—কারণ আমি ছিলাম ক্লাস ক্যাপ্টেন, একপ্রকার প্রচণ্ড ক্ষমতার অধিকারী।
এইভাবেই দুরন্তপনা, শাসন, শৃঙ্খলা, পড়ালেখা আর গ্রামবাংলার সাদামাটা পরিবেশে গড়ে উঠেছিল আমার আশির দশকের শৈশব—যা আজও স্মৃতির পাতায় অমলিন হয়ে রয়েছে।